সকালের শুরুটা যেমন হয়, দিনের বাকি সময়টাও অনেকটা তেমনই কাটে। ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা পান করা, নাশতা এড়িয়ে যাওয়া কিংবা বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন স্ক্রল করা অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। তবে এসব সাধারণ অভ্যাসের কিছু কিছু দীর্ঘমেয়াদে লিভারের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার। খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদান প্রক্রিয়াজাত করা, চর্বি ও শর্করার বিপাক নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ ও অ্যালকোহল ভাঙাসহ শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে এই অঙ্গটি জড়িত। কিন্তু লিভারের অনেক রোগের ক্ষেত্রে শুরুতে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তাই সুস্থ লিভার বজায় রাখতে প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসে সচেতন পরিবর্তন আনা জরুরি।
নাশতা না খাওয়ার অভ্যাস
ওজন কমানো বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের কারণে অনেকেই সকালের নাশতা বাদ দেন। তবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা সবার জন্য উপকারী নাও হতে পারে। সারারাত উপোস থাকার পর রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে লিভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে শরীর সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে শক্তির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করে।
তাই সকালে খুব বেশি ক্ষুধা না লাগলেও সম্পূর্ণ খালি পেটে না থেকে সেদ্ধ ডিম, ওটস, বাদাম বা চিয়া বীজসমৃদ্ধ হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
সকালের খাবারে অতিরিক্ত চিনি থাকা খাবার নিয়মিত খাওয়াও লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। মিষ্টি সিরিয়াল, জ্যাম-টোস্ট, মাফিন কিংবা অতিরিক্ত চিনি মেশানো গ্র্যানোলায় উচ্চমাত্রার চিনি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ গ্রহণের সঙ্গে লিভারে চর্বি জমার সম্পর্ক রয়েছে, যা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মধু বা প্রাকৃতিক মিষ্টি ব্যবহার করলেই কোনো খাবার কম চিনিযুক্ত হয়ে যায়—এমন ধারণাও সঠিক নয়।
খালি পেটে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট সেবন
অনেকে ঘুম থেকে উঠেই ভিটামিন, সাপ্লিমেন্ট বা বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে থাকেন। তবে সব ধরনের ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খালি পেটে গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। কিছু ক্ষেত্রে এতে পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণও লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ভেষজ বা তথাকথিত ‘হারবাল ক্লিনজ’ পণ্য লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নতুন কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করাই ভালো।
ঘুম থেকে উঠে নিষ্ক্রিয় থাকা
অ্যালার্ম বন্ধ করার পর দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে ফোন ব্যবহার করার অভ্যাসও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। সকালে জিমে যাওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও কয়েক মিনিট হাঁটা, হালকা স্ট্রেচিং বা সহজ ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক, যা লিভারের সুস্থতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
‘ডিটক্স ড্রিংক’-এর ওপর নির্ভরতা
লেবু, আপেল সিডার ভিনেগার, হলুদ, রসুন বা বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে তৈরি ‘ডিটক্স ড্রিংক’ বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। তবে লিভার পরিষ্কার বা ‘ডিটক্স’ করার জন্য এসব পানীয়ের প্রয়োজন আছে—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বরং অতিরিক্ত ভেষজ উপাদান বা অজানা পণ্য নিয়মিত গ্রহণ করলে লিভারের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।
রাত জাগার অভ্যাস
লিভারের সুস্থতার ক্ষেত্রে শুধু সকালের অভ্যাস নয়, আগের রাতের জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত রাত জাগা, অনিয়মিত ঘুম কিংবা ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘুমের ঘাটতি রক্তে শর্করার মাত্রা ও বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, যা পরোক্ষভাবে লিভারের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার কমানো প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভার সুস্থ রাখতে দামি ডিটক্স পণ্য, জটিল ডায়েট বা অপ্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন নেই। বরং সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে লিভারকে ভালো রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।