দেশের বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট বিএনপি সরকারের সৃষ্টি নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই সমস্যাকে সরকার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না। সংকট সমাধানে ইতোমধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং খুব দ্রুত এর সমাধান হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী দিনের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। স্বৈরাচার শাসনামলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং দেশকে গ্যাস আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০-১২ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে গ্যাস ও তেল আমদানিতে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কারণে জনগণ সাময়িকভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। তবে জনগণের দুর্ভোগের জন্য কোনো অজুহাত দেখিয়ে সরকার দায়িত্ব এড়াতে চায় না। সমস্যা মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই বিদ্যুতের সাময়িক সংকটের অবসান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দেশকে আমদানিনির্ভরতা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু বিদ্যুতের গ্রাহক থাকবে না, বরং সৌরবিদ্যুতের উৎপাদক দেশেও পরিণত হবে।
তিনি বলেন, আমরা কি ধরণের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছি সেটি বিরোধী দল যেমন জানেন, জনগণও জানে।গ্যাস বিদ্যুৎ, শিল্প কারখানা, শিক্ষা ব্যবস্থা, ব্যাঙ্কিং ব্যাবস্থাপনা প্রতি সেক্টরেই দুর্নীতি আর অনিয়মের পাহাড়।
বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু সহযোগিতার পরিবর্তে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা গাড়িবহর নিয়ে লং মার্চ করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, গাড়ির বহর নিয়ে লং মার্চ করে যদি গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হতো, তাহলে সরকারও সেই লং মার্চে অংশ নিত।
প্রধানমন্ত্রী অতীত মনে করিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের সময় ২০২২ সালে তৎকালীন সরকারও অফিস, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছিল। তাই বর্তমান সংকটের বাস্তবতা সবার সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বিরোধী দলেরও রয়েছে।
জাতীয় সংসদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের এই সংসদের প্রতি অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে জনগণের আদালতে জবাবদিহি করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সংসদকেই সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করতে চান বলেও জানান তিনি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দলটিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তাই বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চায় সরকার।
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১ শতাংশ দেখানো হলেও ২০২৫ সালে ফরেনসিক অডিটে তা ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ পাওয়া যায়। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বর্তমানে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হলেও তা যেন বাকশালীনতার সীমা অতিক্রম না করে। গালাগালিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত করা যাবে না। মতভিন্নতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়।
সরকারি দল ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করে কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রপন্থি শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ শেষ পর্যন্ত পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনরুত্থানের পথ তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলকে দেশ গঠনে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।