1. info@www.dailysonalisurjo.com : দৈনিক সোনালী সূর্য :
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৮ অপরাহ্ন

কোন দেশ কীভাবে সামলাচ্ছে জ্বালানি সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে




যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের অভিঘাত এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের উঠানে আটকে নেই। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, এলএনজির দাম উঠেছে দ্বিগুণের বেশি। বাড়তি দাম দিয়েও অনেক দেশ সময়মতো জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না। সংকট সামাল দিতে কোথাও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, কোথাও ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে, আবার কোথাও জ্বালানি রেশনিংয়ের পথে গেছে সরকার।

তবে এ সংকটের গল্প সবার জন্য এক নয়। কোনো দেশ যেখানে জ্বালানি সংকটে হিমশিম খাচ্ছে, অনেকেই সেখানে বাড়তি দামের সুবিধা নিয়ে বিপুল আয় করছে। আবার কেউ কেউ যুদ্ধের আগেই যে মজুদ, বিকল্প আমদানির পথ ও সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করে সুফল পাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংকট মোকাবিলায় একটি দেশের আর্থিক সামর্থ্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আগাম প্রস্তুতি, জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত মজুদ। যেসব দেশ আগে থেকেই বিকল্প উৎস ও মজুদ নিশ্চিত করেছিল, তারা তুলনামূলক

কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপরীতে, একক উৎস বা আমদানিনির্ভর দেশগুলো পড়েছে সবচেয়ে বড় চাপে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আগাম প্রস্তুতিতে এগিয়ে চীন-জাপান: এ সংকটে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা দেশগুলোর অন্যতম চীন। এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা থেকে ছাড়কৃত দামে তেল কিনে বড় মজুদ গড়ে তুলেছে দেশটি। একই সঙ্গে প্রায় ৫০টি দেশ থেকে তেল আমদানি করে সরবরাহের উৎসও বহুমুখী করেছে।

সমুদ্রপথে সরবরাহ ব্যাহত হলেও চীনের তিনটি স্থলপথ পাইপলাইন করিডর বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। কয়লা ও দ্রুত সম্প্রসারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও দেশটির গ্যাসনির্ভরতা কমিয়ে রেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও চীনের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে তুলনামূলক কম চাপ পড়েছে। উল্টো সংকটটি চীনের সৌর ও ব্যাটারি প্রযুক্তি রপ্তানির নতুন বাজার তৈরি করেছে।

জাপানের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এখন কাজে লাগছে। দেশটির মোট জ্বালানি সরবরাহের ৮৭ শতাংশ আমদানিনির্ভর হলেও বিশাল কৌশলগত মজুদ রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চের মাঝামাঝি জাপান রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ে, যা প্রায় ৪৫ দিনের চাহিদার সমান।

দেশটির মোট তেল মজুদ প্রায় ৪৭ কোটি ব্যারেল—জাতীয় চাহিদার প্রায় ২৫৪ দিনের সমান। পাশাপাশি তিন সপ্তাহের এলএনজি মজুদ রয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আবার চালু করার উদ্যোগ এবং রুশ এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ছাড় নবায়নও জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানকে কিছুটা সুবিধা দিয়েছে।

বিকল্প পথ তৈরি করেই সুবিধায় আফগানিস্তান: আফগানিস্তানের চিত্রটি আরও ভিন্ন। ইরান থেকে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলেও দেশটি আগে থেকেই তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান ও রাশিয়া থেকে বিকল্প আমদানির পথ তৈরি করেছিল। ফলে সাময়িক চাপের পর দেশটির জ্বালানির দাম বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও চীনের তুলনায় আফগানিস্তানে জ্বালানির দাম এখন কম— যা দেখিয়ে দিচ্ছে, সংকটের সময় বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপে মজুদ থাকলেও ঝুঁকি কাটেনি: ইউরোপের ইতালি ও জার্মানির মতো দেশগুলো অবশ্য চাপের বাইরে নয়। সেখানে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে বিদ্যুতের দামও।

ইতালির বিদ্যুতের ৪০ শতাংশের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় দেশটি আলজেরিয়ার সঙ্গে বিকল্প সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

জার্মানিও দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি আমদানিনির্ভর। দেশটির মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৬৭ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ২০২৫ সাল থেকেই কম গ্যাস মজুদ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বর্তমান সংকটের পর দেশটির গ্যাসশিল্প কৌশলগত সংকটকালে রিজার্ভ তৈরির দাবি তুলেছে।

সবচেয়ে বেশি চাপে আমদানিনির্ভর দেশগুলো: সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে। ভারত রুশ তেলের দিকে আরও ঝুঁকেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাময়িক ছাড় নিয়ে রুশ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করছে।

তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশও ব্যাপক চাপে পড়েছে। সিঙ্গাপুরের এলএনজির প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের ২৮ শতাংশ কাতারনির্ভর হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে তাদের ওপর।

থাইল্যান্ডের জ্বালানি তহবিল এপ্রিলেই প্রায় ১৯০ কোটি ডলার ঘাটতিতে পড়ে। পরিস্থিতি সামলাতে দেশটি বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফের চালু করা এবং পুরনো কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

অস্ট্রেলিয়া বড় গ্যাস ও কয়লা রপ্তানিকারক হলেও পরিশোধিত জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে। ফলে যুদ্ধের পর দেশটিতে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। সরকার জ্বালানি শুল্ক অর্ধেক কমানোর পাশাপাশি ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি জ্বালানি নিরাপত্তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

ফিলিপাইন চার মাসের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জ্বালানি সংকট’ ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানে যুদ্ধের আগে যেখানে মাসে তেল আমদানি বিল ছিল প্রায় ৩০ কোটি ডলার, তা বেড়ে ৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

ভর্তুকি দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা: মালয়েশিয়ায় পেট্রল ও ডিজেল ভর্তুকির সরকারি ব্যয় মাসে ৭ গুণ বেড়ে ১৩০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। তবে শক্তিশালী বন্ড বাজার, তুলনামূলক স্থিতিশীল মুদ্রা ও নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি দেশটিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।

নাইজেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক হলেও অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করায় তারাও সংকটে পড়েছে। দেশটিতে জ্বালানির দাম ৫০-৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রায় ১৬৭ কোটি ডলারের ভর্তুকি দিয়েছে।

মিসর এবং মরক্কোও রেশনিং ও ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে নেপাল ও ভুটান দ্রুত সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। নেপালের চীন থেকে সৌর সরঞ্জাম আমদানি একপর্যায়ে ১২ গুণের বেশি বেড়েছে।

সংকটের মধ্যেও কারও কারও রমরমা ব্যবসা: বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সংকট যখন অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন কিছু দেশ ও কোম্পানির জন্য এটি পরিণত হয়েছে বড় লাভের সুযোগে। রাশিয়া তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি। যুদ্ধের আগে রুশ ইউরাল ক্রুডের দাম যেখানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৫৭ ডলার ছিল, তা বেড়ে ১১৫ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারতের রুশ তেল কেনার সাময়িক ছাড় পাওয়ায় রাশিয়ার রপ্তানি আয় আরও শক্তিশালী হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোও বিপুল মুনাফা করছে। এক্সনমোবিল এক প্রান্তিকে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে— চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শেভরনের মুনাফাও কয়েক গুণ বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালির সরবরাহঝুঁকির কারণে মার্কিন এলএনজি কোম্পানিগুলোও সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এসেছে। চেনিয়ার এনার্জির এক প্রান্তিকে রাজস্ব ২৪ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভেঞ্চার গ্লোবালের শেয়ারও ৯০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

হরমুজ এড়িয়ে সুবিধায় সৌদি-ওমান: যুদ্ধের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো— জ্বালানি উৎপাদন করলেই হবে না, বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যুদ্ধের পর দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল ইয়ানবু বন্দরের দিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

ওমানের প্রধান তেলবন্দরগুলোও হরমুজ প্রণালির বাইরে। ফলে দেশটির রপ্তানি কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়নি; বরং যুদ্ধের পর তাদের রাজস্ব প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে।

জার্মানির অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এবারের সংকটে উপসাগরীয় দেশগুলোর চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও ব্রাজিলের মতো অ-উপসাগরীয় রপ্তানিকারকরাই বেশি সুবিধা পাচ্ছে। কারণ তাদের সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে।

যুদ্ধের কেন্দ্রে যে বাস্তবতা: যুদ্ধের সরাসরি ক্ষত বহন করছে ইরান। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় দেশটির দৈনিক ৬৫ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের মধ্যে প্রায় ২৩ কোটি ঘনমিটার উৎপাদন নষ্ট হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

ইরানের দৈনিক পেট্রলের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ লিটার হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ লিটার।

অন্যদিকে যুদ্ধের শুরুতে নিরাপত্তার কারণে ইসরায়েলের লেভিয়াথান ও কারিশ গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ থাকলেও এপ্রিল থেকে উৎপাদন আবার স্বাভাবিক হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎসটি মোটামুটি সচল রয়েছে। তবে ইসরায়েলেও জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। প্রতি লিটার পেট্রলের দাম প্রায় ২ দশমিক ৬৬ ডলার। এর বড় কারণ অবশ্য শুধু যুদ্ধ নয়— দেশটির জ্বালানি মূল্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই কর ও বিভিন্ন ফি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কর কমিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা: এই বৈশ্বিক সংকট শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই স্পষ্ট করে দিয়েছে— জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু কত দামে তেল বা গ্যাস কেনা যাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। কোথা থেকে কেনা হচ্ছে, কত দিনের মজুদ আছে, বিকল্প সরবরাহপথ কতটা প্রস্তুত এবং সংকটের সময় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা কতটা— সবকিছু মিলেই নির্ধারণ করে একটি দেশ কতটা নিরাপদ।

চীন ও জাপানের বিশাল মজুদ, আফগানিস্তানের বিকল্প আমদানি পথ কিংবা সৌদি আরবের হরমুজ-বিকল্প পাইপলাইন দেখিয়ে দিচ্ছে— সংকট শুরু হওয়ার পর সমাধান খোঁজার চেয়ে সংকটের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক সোনালী সূর্য-২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট
error: Content is protected !!