ঋণ বাড়লেও কমেছে পরিবহন ও নির্মাণ খাতে

ব্যাংক খাতের পুরোনো ঋণ পরিশোধ হলেও নতুন ঋণ বিতরণ কমে গেছে। বিশেষ করে নির্মাণ ও পরিবহন খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি কমেছে। অন্যদিকে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ঋণ বাড়লেও প্রকৃতপক্ষে তা নতুন ঋণের প্রবৃদ্ধি নয়। কারণ সুদ যুক্ত হয়ে এসব খাতের ঋণের স্থিতি বেড়েছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গত জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনীতিতে গতি কমে যাওয়ায় নির্মাণ ও পরিবহন—দুই খাতেই নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকঋণের চাহিদায়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নির্মাণসামগ্রীর বাড়তি দামের কারণে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণে নতুন প্রকল্পের গতি কমেছে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যবসায় আয় বৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়ায় নতুন যানবাহন ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগও কমেছে। ফলে দুই খাতের ঋণ কমে গেছে।
যেসব খাতে ঋণ কমেছে
নির্মাণ খাতে ঋণ ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে নির্মাণ খাতে ঋণের স্থিতি ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে তা কমে হয়েছে এক লাখ ২৩ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। জুন শেষে আরো কমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। তিন মাসে এ খাতে ঋণের স্থিতি কমেছে ৩,৯০৯ কোটি টাকা। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই নির্মাণ কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। ফলে এ খাতে ঋণের স্থিতি কমে গেছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল ইসলাম বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কমে যাওয়ারও বড় প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ উন্নয়ন প্রকল্পনির্ভর ছিল। গত কয়েক বছরে আগের অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু নতুন প্রকল্পের কাজও তেমন শুরু হয়নি। ফলে সরকারি ব্যয় কমার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঋণের চাহিদাও কমেছে।
পরিবহন খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এ খাতের ব্যাংকঋণও ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে ঋণের স্থিতি ছিল ১০ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে তা কমে ৯,৬৮৪ কোটি টাকা হয়েছে। আর জুন শেষে তা আরো কমে ৯,২৩১ কোটি টাকায় নেমেছে।
যেসব খাতে ঋণ বেড়েছে
নির্মাণ ও পরিবহনসহ উৎপাদনমুখী খাতগুলোর অবস্থা খারাপ হলেও ভোক্তা ঋণ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ভোক্তা ঋণের স্থিতি ছিল এক লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। তিন মাসে এ খাতে ঋণ বেড়েছে ৫,৩৬৪ কোটি টাকা।
মানুষ সাধারণত অভিজাত পণ্য, বিলাসবহুল পণ্য ও পরিষেবার জন্য ভোক্তা ঋণ নিয়ে থাকে। এছাড়া দৈনন্দিন নানা কাজে, অনুষ্ঠান, জমি বা বাড়ি কেনা, গাড়ি কেনা, বড় আয়োজন ও ভ্রমণসহ নানা প্রয়োজনে ভোক্তা ঋণ নেওয়া হয়। যেমন—ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণও ভোক্তা ঋণের তালিকায় পড়ে।
তবে আর্থিক দুরবস্থার কারণে বিলাসবহুল পণ্যে খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তারপরও কেউ কেউ মাসের বাজার খরচ মেটাতেও ভোক্তা ঋণ নিচ্ছেন।
এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে তিন মাসে ২২ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা খাতে ঋণ যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে হারে শিল্প খাতে ঋণ যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে শিল্প খাতে ঋণ মাত্র ৫৫২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মার্চে এ খাতের ঋণের স্থিতি ছিল সাত লাখ ৯৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। জুনে তা বেড়ে হয়েছে সাত লাখ ৯৫ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা জানান, শিল্প খাতে ঋণ যেটুকু বেড়েছে, তা নতুন ঋণ নয়। সুদ যুক্ত হয়ে ঋণের স্থিতি বেড়েছে। জ্বালানিসহ নানা সংকটে এ খাতের উদ্যোক্তারা এখন নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন না। ফলে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘শিল্প খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি না হওয়া উদ্বেগের বিষয়। আগে যেখানে শিল্প খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল, এখন সেখানে নতুন ঋণ যাচ্ছে না। বর্তমানে নতুন করে ঋণ নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই শিল্প উদ্যোক্তারা। বিদ্যমান কারখানাগুলোই টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ বা ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের সমাধান না হলে শিল্প খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে না। উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্যোক্তারা নতুন করে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে যেতে চাইবেন না। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতে ঋণের প্রবাহ কম থাকাটাই স্বাভাবিক।’













