
আছিয়া থেকে রামিসা: ধর্ষণ-হত্যার পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা, নাকি আরও গভীর সংকট?
গত পরশু রাত নয়টার দিকে ৬০ বছরের এক লোক ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে কলাবাগানে।
গতকাল সকালেই রূপনগরে কিস্তির টাকা তুলতে গেলে বাসায় বাবা-মা না থাকার সুযোগে একটা ১৪/১৫ বছরের এক মাইনর ছেলে ওর চেয়ে দ্বিগুনবয়সী একজন নারী এনজিওকর্মীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে।
দুই ঘটনাতেই অপরাধী আটক হয়েছে। কিন্তু এই যে বিপরীতধর্মী অসম দুটি যৌননিপীড়ণের ঘটনা খোদ রাজধানীতে এবং এত প্রবল বিক্ষোভের সময় ঘটলো- এগুলো কোন শাস্তিতে আটকানো যাবে?
এই অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে অপরাধের মূল কগনিটিভ ফোর্স মেজার করতে না পারলে আদৌ শাস্তি দিয়ে কি অপরাধ কমানো যাবে? ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু সেটি বলে না! তাহলে সমাধান কি?
ভাবুন, সবাই মিলে ভাবুন। দোষারোপ, মব, প্রতিহিংসা, রাজনীতি, হীন স্বার্থোদ্ধার এসব কিছুর উর্ধ্বে উঠে ভাবুন। রাষ্ট্রের সব অর্গান, সব প্রতিষ্ঠান, সব শ্রেণী, সব পেশার সম্মিলিত ও ইনটেনসিভ প্রয়াস ছাড়া এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়। সময় ফুরিয়ে গেলে বিপদ যে কারো ঘরেই চলে আসতে পারে।
রাজধানীর মিরপুর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা। এর আগে আছিয়া, তনুসহ অসংখ্য ধর্ষণ। এসব ঘটনাকে কি শুধু আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ দেখিয়েই আমরা পার পেয়ে যেতে পারি না এর পেছনে আরো কিছু কারণ রয়েছে যা আমাদের সমাজে হরহামেশাই দেখা যায় এবং আমরা দেখেও না দেখার ভান করে থাকি।
একটু কি ভেবে দেখেছেন এই বিষয়ে?
রামিসা হত্যাকান্ডের ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯ মে সোহেল শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন এবং মরদেহ গুম করার চেষ্টা করেন। সোহেল আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন। ঘটনার আগে তিনি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে আগে কোনো শত্রুতা ছিল না।
এর সাথে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে এমন কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে যা দেখে মানুষ থমকে গেছে। নিষ্ঠুরতার ধরন দেখে মনে হয়েছে — এটা কোনো “স্বাভাবিক মানুষ” করতে পারে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো — এই মানুষগুলো কি জন্ম থেকেই এমন ছিল?
গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা।
সাইকো কিলার এবং ধর্ষক হয়ে উঠার পেছনে অনেক কারণের সাথে যে তিনটি বিষয়ই মোটামুটি ভাবে কমন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্নোগ্রাফি, নেশা এবং অধিক স্ক্রিনটাইম এর মতো ঘটনা যেগুলো আজকাল আমাদের কাছে নরমাল হয়ে গেছে বা নর্মালাইজ করা হয়েছে। এসব বিষয় আমরা দেখেও না দেখার ভান করে থাকি যা ধীরে ধীরে এমন একটা প্রজন্ম গড়ে তুলছে যাদের ভবিষ্যত ভাবলেও গা শিওরে উঠবে।
পর্নোগ্রাফি দেখলে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয় — ঠিক যেভাবে হয় মাদক এবং অধিক স্ক্রিনটাইমে।
বারবার পর্নোগ্রাফি দেখলে মস্তিষ্ক “আরও বেশি উত্তেজনা” খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে সাধারণ কন্টেন্টে আর কাজ হয় না। তখন শুরু হয় হিংসাত্মক, নিষ্ঠুর কন্টেন্টের দিকে ঝোঁক। এক পর্যায়ে অনুভূতি মরে যেতে শুরু করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পর্নোগ্রাফি দেখলে এবং নেশার সাথে সম্পৃক্ত থাকলে —
*অন্যের কষ্টে সহানুভূতি কমে যায়
*মানুষকে “বস্তু” মনে হতে শুরু করে
*বাস্তব ও কল্পনার পার্থক্য ঘুচে যায়
আর এই তিনটি জিনিস যখন একসাথে হয় —তখন একজন মানুষ “কিলার মাইন্ডসেট”-এ প্রবেশ করতে পারে।
ঠিক একই ভাবে অধিক স্ক্রিনটাইমে যেহেতু প্রচুর পরিমাণ ডোপামিন নিঃসরণ হয় তাই অধিক স্ক্রিনটাইমও মস্তিষ্ক বিকৃত করে ফেলে আর এই কারণেই যেসকল শিশু, কিশোর অধিক সময় মোবাইল, কম্পিউটারে সময় দেয় তাদেরকে পরিবারের সাথে খারাপ আচরণ করতে দেখা যায়।
এফবিআইয়ের সিরিয়াল কিলার স্টাডিতে দেখা গেছে — ধরা পড়া অধিকাংশ সিরিয়াল কিলার হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি বা নেশায় আসক্ত ছিল।
টেড বান্ডি (বিখ্যাত সিরিয়াল কিলার) মৃত্যুর আগে স্বীকার করেছিল — পর্নোগ্রাফিই তাকে এই পথে নিয়েছে। আবার রামিসার হত্যাকারী সোহেলের টেস্ট রিপোর্ট থেকে দেখা যায় সে ধর্ষণের আগে ইয়াবা সেবন করছিলো।
হিংসাত্মক পর্নোগ্রাফি দেখা ব্যক্তিদের মধ্যে যৌন সহিংসতার প্রবণতা ৩১% বেশি
বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্মার্টফোন সস্তা হয়েছে,ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়েছে। হাত বাড়ালেই মিলছে নেশাদ্রব্য। পর্নোগ্রাফি সাইটেও প্রবেশ করতে পারছে অনায়াসে।
কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা সেভাবে বাড়েনি এবং অনেক পরিবারেই ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে ছোট বেলা থেকেই বাচ্চাদের বড়ো করার ব্যাপারে অনীহা দেখা যায়। নেশার বিরুদ্ধে আমরা তেমন কোন স্টেপ নিতে পারছি না। বাচ্চাদের শান্ত করতে স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছি আমরা নিজেরাই। এসব মিলিয়ে আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি যেখানে তৈরি হচ্ছে অগণিত সাইকো কিলার আর ধর্ষক। নিজের ঘরে আঘাত হানার আগেই আমাদের এসব বিষয়ে নজর না দিলে সামনে আমাদের জন্য কেমন দিন অপেক্ষা করছে তা ভাবতেই ভয়ে গায়ের লোম শিওরে হয়ে উঠে।