সন্তান কোথায় আছে, শুধু সেটি নয়—জানতে হবে কার সঙ্গে আছে

সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু তাকে ভালো খাবার, পোশাক, শিক্ষা কিংবা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী ধরনের পরিবেশে সময় কাটায় এবং তার জীবনে কী পরিবর্তন ঘটছে—এসব বিষয়ও অভিভাবকের জানা প্রয়োজন। তবে সেই জানার পদ্ধতি যেন সন্দেহ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে না হয়; বরং বিশ্বাস ও পারিবারিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ ও দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করবে তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়া। তাই এ বিষয়ে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে একটি শিশুর এমন পরিণতি আমাদের অভিভাবকত্বের ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে।
সন্তানের জন্য ভালো স্কুল নির্বাচন করা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কিনে দেওয়া কিংবা তার চাহিদা পূরণ করা অবশ্যই দায়িত্বের অংশ। কিন্তু এর পাশাপাশি জানা দরকার—তার বন্ধু কারা, কোথায় তারা সময় কাটায়, সন্তানের পরিচিত মানুষের পরিসর কেমন এবং তার দৈনন্দিন জীবনে নতুন কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—সন্তানের প্রতি খোঁজখবর রাখা এবং তাকে অবিশ্বাস করা এক জিনিস নয়। প্রতিটি মুহূর্তে জিজ্ঞাসাবাদ করা কিংবা ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ন্ত্রণ করা সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। বরং এমন পারিবারিক পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে সন্তান নিজের আনন্দ, ভয়, ভুল, বন্ধুত্ব কিংবা সমস্যার কথা নির্ভয়ে বাবা-মাকে বলতে পারে।
একজন সন্তান যদি স্বাভাবিকভাবে জানাতে পারে সে কার সঙ্গে খেলেছে, কোথায় গেছে, কার বাড়িতে সময় কাটিয়েছে বা ভবিষ্যতে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, তাহলে অভিভাবক তার সামাজিক পরিসর সম্পর্কে ধারণা রাখতে পারেন। এতে অযথা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কমে এবং প্রয়োজনের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।
বর্তমান প্রজন্মের বেড়ে ওঠার বাস্তবতাও বদলে গেছে। আগের মতো শুধু স্কুল, মাঠ ও পাড়ার বন্ধুত্বের মধ্যেই শিশু-কিশোরদের পৃথিবী সীমাবদ্ধ নেই। স্মার্টফোন, অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্তান শিক্ষা নিতে পারে, নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সৃজনশীল কাজ করতে পারে। কিন্তু সে অনলাইনে কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং তার ডিজিটাল পরিচিতির পরিধি কতটা—এসব সম্পর্কে বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিভাবকের সচেতন থাকা দরকার।
বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সন্তানের বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, প্রয়োজন হলে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সন্তান কোন সামাজিক পরিবেশে সময় কাটাচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করা অভিভাবকত্বের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। এর উদ্দেশ্য সন্দেহ সৃষ্টি করা নয়; বরং সন্তানের চারপাশের মানুষ ও পরিবেশ সম্পর্কে দায়িত্বশীল ধারণা রাখা।
কৈশোরে পৌঁছানোর পর সন্তান স্বাভাবিকভাবেই নিজের স্বাধীনতা চাইবে। নিজের বন্ধু বেছে নেবে, নিজের মতামত তৈরি করবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবে। এই সময় বাবা-মায়ের দায়িত্ব আরও সূক্ষ্ম। একদিকে তাকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা ও বয়সের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক যেন ভয়ের না হয়।
কোনো ভুলের কথা বললে অপমানিত হতে হবে, কঠোর শাস্তি পেতে হবে কিংবা পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাতে হবে—এমন আশঙ্কা থাকলে সন্তান অনেক বিষয় গোপন করতে পারে। আর কোনো বিষয় গোপন থাকলে অভিভাবকের পক্ষেও সময়মতো পরিস্থিতি বোঝা বা প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই সন্তান ভুল করলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া। কী ঘটেছে তা শোনা, তার অবস্থান বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সীমা ও দায়িত্বের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা। সন্তান যেন জানে—ভুল হলেও পরিবারের কাছে ফিরে আসার জায়গাটি তার জন্য খোলা।
জীবনের ব্যস্ততায় অনেক বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সময় কাটাতে পারেন না। চাকরি, ব্যবসা, সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যেও সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার সময় তৈরি করা জরুরি। কারণ সন্তানকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তিগুলোর একটি হলো পারস্পরিক যোগাযোগ।
সন্তানকে শুধু বড় করে তোলা যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে সম্পর্কটাকেও পরিণত করতে হয়। তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে হয়, তার আগ্রহ বুঝতে হয়, তার অনলাইন জগত সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয় এবং কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে স্বাভাবিকভাবে সে তথ্য জানার অভ্যাস তৈরি করতে হয়।
অভিভাবকের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একজন নিরাপদ মানুষ হয়ে ওঠা, যার কাছে সন্তান আনন্দের কথা যেমন বলতে পারে, তেমনি বিপদ, ভয় কিংবা ভুলের কথাও বলতে পারে।
কোনো অভিভাবকের পক্ষেই সন্তানকে পৃথিবীর প্রতিটি ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু সন্তানের জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন না রেখে তার পাশে থাকা সম্ভব। একটি শক্তিশালী পারিবারিক সম্পর্ক অনেক সময় পরিবর্তিত আচরণ বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দ্রুত বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
অপ্রতীমের পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। একই সঙ্গে এই বেদনাদায়ক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজের প্রতিটি পরিবার নিজেদের অভিভাবকত্বের ধরন নিয়ে ভাবতে পারে। সন্তানকে শুধু প্রশ্ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে শুনতে হবে, তার বন্ধু ও পরিবেশ সম্পর্কে জানতে হবে, তার বাস্তব ও ডিজিটাল জগত বুঝতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তাকে এমন বিশ্বাসের জায়গা দিতে হবে, যেখানে প্রয়োজনের মুহূর্তে সে বাবা-মায়ের কাছেই ফিরে আসতে পারে।
সন্তানের নিরাপত্তার প্রথম দেয়াল সবসময় কঠোর নিয়ন্ত্রণ নয়—অনেক সময় সেটি হয় **বিশ্বাস, যোগাযোগ ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক।**













