বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। নতুন কাঠামোয় প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা। দীর্ঘ ১২ বছর পর নতুন এই পে স্কেল বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে এবং তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৯তম বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা আরও যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় তথ্য অধিদফতরের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি।
তিনি জানান, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্রবাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬-ও অনুমোদন করা হয়েছে, যা একই দিন থেকে কার্যকর হবে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সুপারিশ তৈরির জন্য গঠিত সচিব কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর, দেশের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত নেয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নতুন পে-স্কেলের মূল বেতনের ৩০ শতাংশ ১ জুলাই থেকে, পরের বছরের শুরুতে আরও ৩৫ শতাংশ এবং তার পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে অবশিষ্ট অংশ কার্যকরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরপর ওই অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের সুপারিশ করা হতে পারে।
উল্লেখ্য, অষ্টম পে কমিশন গঠনের প্রায় এক দশক পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় পে কমিশন গঠন করে। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
ন্যায্যতার কথা বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বাড়বে ১৪২ শতাংশ, আর সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন বাড়বে ১০০ শতাংশ।
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকার এক গ্রেড এক পেনশন পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং ২০১৯ সালের আগে অবসরগ্রহণকারী অসামরিক কর্মচারীদের তথ্যের ঘাটতির কারণে এটি পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে অবসরভোগীদের নিট পেনশন স্ল্যাব অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে—মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনভোগীদের জন্য ১০০ শতাংশ, ৯,০০১-২০,০০০ টাকার জন্য ৭৫ শতাংশ, ২০,০০১-৩০,০০০ টাকার জন্য ৬৫ শতাংশ, ৩০,০০১-৪০,০০০ টাকার জন্য ৬০ শতাংশ এবং ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনভোগীদের জন্য ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া ও তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া কর্মচারীরা এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো মাসিক ৩ হাজার টাকা করে প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে শুধু ৫ম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন, নতুন স্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারীই এই সুবিধা পাবেন।
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যার সংস্থান মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হয়েছে।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হবে।