
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার মধ্যে থাকা অব্যবহৃত জমিতে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ জন্য ৬০৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা ব্যয়ের একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নজমুল হক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, মাতারবাড়ীর ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার মধ্যে থাকা ১৭১ একর অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার জন্য তৈরি খসড়া ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, প্রকল্প ঋণ থেকে ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা প্রকল্পটিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধা কাঠামোর আওতায় প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে। এ কাঠামোয় ৩৫ কোটি ইউরো ঋণ ও ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় ছাই সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৬৩০ একর জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০৫ একর জমিতে ছাইয়ের পুকুর তৈরি করা হয়েছে। ফলে অব্যবহৃত রয়েছে ৫২৫ একর। এই জমির একটি অংশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না।
এ ছাড়া ছাইয়ের পুকুর ঘিরে আগে থেকেই ১৪ মিটার উঁচু বাঁধ থাকায় নতুন করে সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন হবে না বলে প্রকল্পের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল, ইনভার্টারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নিকটবর্তী মাতারবাড়ী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত এক কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ওভারহেড সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
পাশাপাশি মাতারবাড়ী ও চকরিয়া ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় সার্কিটের ওভারহেড কন্ডাক্টর স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া মাতারবাড়ীতে তিনটি এবং চকরিয়ায় একটি—মোট চারটি ১৩২ কেভি এয়ার ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার (এআইএস) বে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের আশা, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে আমদানি করা সরঞ্জাম খালাস ও পরিবহন সহজ হবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রথমে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। পরে সমীক্ষায় এর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ৭০ মেগাওয়াট করার সুপারিশ করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বাসসকে জানান, প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে শিগগিরই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সাত নম্বর লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ লক্ষ্যের উদ্দেশ্য সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিত করা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎসের সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৫৪ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।
প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার আগে কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একই ধরনের চলমান বা শেষ হওয়া প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে প্রধান সরঞ্জামের প্রস্তাবিত দাম বিশ্লেষণ, অর্থায়ন কাঠামোর বিষয়ে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নেওয়া এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত মনে হলেও সিপিজিসিবিএল মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ বা প্রায় ২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা নিজস্ব অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে।
পিইসি সভায় সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের গুণগত মান এবং বাজারদর পর্যালোচনা করা হবে। এ ছাড়া যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার জন্য ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের যৌক্তিকতা যাচাই করা হবে। মোটরসাইকেলের সংখ্যা ‘লট’ হিসেবে না দেখিয়ে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করার বিষয়টিও পর্যালোচনায় রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা এবং বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। পাশাপাশি সংস্থা ও অবস্থানভিত্তিক তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন ও অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র : বাসস



