
বিশ্বের নানা প্রান্তে রাজপথে নামছেন তরুণেরা। কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে, কোথাও পরীক্ষায় অনিয়ম ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে, আবার কোথাও দুর্নীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে ক্ষোভ জানাতে। দেশ ও পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও এসব আন্দোলনে একটি সাধারণ প্রশ্ন সামনে আসছে—তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার কতটা দায়িত্বশীল?
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, ভারতে পরীক্ষা কেলেঙ্কারি, আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর সংস্কার ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা—দেশ ভিন্ন হলেও তরুণদের ক্ষোভের জায়গায় মিল রয়েছে। ফ্রান্স, ভারত ও আলবেনিয়ায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ঘটনাগুলো ব্যাপারটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে ব্যাপক সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। গত বছরও মরক্কো, নেপাল, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন, পেরুসহ বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে। এসব বিক্ষোভের পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল সরকারি সেবা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার মতো বিষয় বারবার উঠে এসেছে
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা, শিক্ষকের সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং শিক্ষায় বৈষম্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।
দেশটির বিভিন্ন শহরে স্কুলশিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, শিক্ষকের সংকট দূর করতে হবে এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার করতে হবে।
বিক্ষোভে যোগ দেন সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও। শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনের বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি ছাপিয়ে আন্দোলনটি তরুণদের মতামত, অধিকার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিচ্ছে।
ভারতে পরীক্ষা কেলেঙ্কারি থেকে রাজনৈতিক জবাবদিহির দাবি
ভারতে তরুণদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের শুরু পরীক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। পরে তা শিক্ষা খাতে জবাবদিহি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।
ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনটির কর্মীরা প্রথমে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মাঠে নামেন। পরে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও দাবি ওঠে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতের এই আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল একটি পরীক্ষা কেলেঙ্কারি বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার সুযোগ, যোগ্যতার স্বীকৃতি, চাকরির সম্ভাবনা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা—সব মিলিয়ে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষ এতে প্রকাশ পাচ্ছে।
আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, উচ্চ টিউশন ফি এবং তরুণদের জন্য সীমিত সুযোগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে টানা কয়েক দিন রাজধানীতে বিক্ষোভ চলে এবং তা অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি সরকারি ভবন ও ব্যাংকের শাখায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগের যথাযথ জবাব দেওয়া হচ্ছে না।
দেশটির দক্ষিণ উপকূলের কিছু অংশে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। সরকার অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রধানমন্ত্রী রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে বিক্ষোভে সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় তার সরকার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
বিক্ষোভ-লুটপাটের পর মিলানে সেনা মোতায়েন করছে ইতালি
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটে রূপ নেওয়ার পর ইতালির মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েন করছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। আগামী শনিবার আরো বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার নতুন কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘোষণাও দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিক্ষোভে সহিংসভাবে অংশ নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, দাঙ্গায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান এবং ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নেওয়া সন্তানের কর্মকাণ্ডের জন্য তার মা-বাবাকে আর্থিকভাবে দায়বদ্ধ করার ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পরও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান
বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলনের আলোচনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলন দ্রুতই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, দুর্নীতি, বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট ও জবাবদিহির দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আনে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলন দমনে সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও হতাহতের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও আন্দোলনকালে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করে।
সরকারের পতনের পর তরুণদের সামনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি কমানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি গুরুত্ব পায়। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত হয়নি।
২০২৪ সালের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটি অংশ পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনরুত্থান এবং সংস্কারের ধীরগতিতে হতাশ হয়ে পড়েছেন। আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারলেও নির্বাচনি রাজনীতিতে সেই শক্তিকে রূপান্তর করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে কর্মসংস্থানও। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ২০২৫ সালের তরুণদের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত নীতিপত্রে বলা হয়েছে, দেশে ৮৫ লাখের বেশি তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নন। তরুণদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি এবং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও কর্মসংস্থানের সংকট প্রকট। প্রতিবেদনে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসংগতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে তরুণদের প্রত্যাশা শুধু চাকরি পাওয়া বা নিয়োগব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান, দুর্নীতির বিচার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিও চান।
সংস্কার প্রশ্নে হতাশার আরেকটি দিক সামনে এসেছে ২০২৬ সালে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কিছু সংস্কার অধ্যাদেশ নতুন সংসদে অনুমোদন পায়নি বা বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, বিচার বিভাগ, পুলিশ সংস্কার ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপও রয়েছে। এসব পরিবর্তন নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, তরুণদের আন্দোলন সরকার পরিবর্তনের মতো বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটাতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া আরও কঠিন। আন্দোলনের মাধ্যমে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, তা পূরণ না হলে হতাশা আবারও নতুন রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
নেপাল, মরক্কো ও অন্য দেশেও একই ধরনের ক্ষোভ
তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের এই ঢেউ শুধু ইউরোপ বা দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালে নেপাল, মরক্কো, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া ও পেরুসহ বিভিন্ন দেশে তরুণেরা বিক্ষোভে অংশ নেন। এসব আন্দোলনের পেছনে ছিল দুর্নীতি, বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ।
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তরুণদের ক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে উঠেছিল। তবে আন্দোলন দ্রুতই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার মতো দীর্ঘদিনের অভিযোগে বিস্তৃত হয়। বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানিও ঘটে।
মরক্কোয় তরুণদের আন্দোলনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। বিশেষ করে বড় আয়োজন ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবার ঘাটতি তাদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
দেশভেদে আন্দোলনের সূচনা ও পরিণতি আলাদা হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: তরুণদের একটি অংশ কেবল অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব নিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক—সেই প্রশ্নও তুলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে প্রতিবাদ
সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দেওয়া, কর্মসূচি সমন্বয়, ভিডিও ও ছবি প্রকাশ এবং বিভিন্ন দেশের আন্দোলন সম্পর্কে জানা এখন আগের তুলনায় সহজ। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে থাকা তরুণেরাও এসব মাধ্যমের সাহায্যে একত্র হচ্ছেন।
অনেক আন্দোলনই কোনো একক নেতা বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের প্রতীক, স্লোগান ও কর্মপদ্ধতি এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনেও অনলাইন যোগাযোগ ও অফলাইন সংগঠিত প্রতিবাদ পরস্পরকে শক্তিশালী করেছিল।
তবে অনলাইনে সংগঠিত হওয়া মানেই আন্দোলনের দাবি পূরণ হয়ে যাওয়া নয়। সরকারের প্রতিক্রিয়া, আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কৌশল, জনসমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিকল্পনা—এসব বিষয়ও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্ষোভ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করলেও অন্য ক্ষেত্রে দমন-পীড়ন বা অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ভবিষ্যৎ
বিশ্বজুড়ে এসব বিক্ষোভের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল সম্ভবত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। শিক্ষা শেষ করে কাজ পাওয়া, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন, সাশ্রয়ী জীবনযাপন, মানসম্মত সরকারি সেবা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের মতামতের প্রতিফলন—এসব প্রত্যাশা পূরণ না হলে তরুণদের মধ্যে হতাশা জমতে পারে।
তবে সব আন্দোলনকে একই ধরনের বা একই উদ্দেশ্যের বলা যাবে না। কোথাও শিক্ষা সংস্কার প্রধান দাবি, কোথাও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, আবার কোথাও ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন মুখ্য। একই আন্দোলনের মধ্যেও বিভিন্ন গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও কৌশলে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিক্ষোভের মাধ্যমে তরুণেরা যে প্রশ্নগুলো সামনে আনছেন, সেগুলোর উত্তর শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে দেওয়া সম্ভব নয়। অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, শিক্ষায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি হতে পারে।
তরুণেরা কী বলছেন?
বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলন নিয়ে মতামত ও অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছে। ফ্রান্স, ভারত, আলবেনিয়াসহ যেসব দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়েছে, সেসব দেশের তরুণদের কাছে জানতে চেয়েছে—কেন তারা রাজপথে নামছেন, তাদের চোখে আন্দোলনের গুরুত্ব কী এবং কী পরিবর্তন প্রয়োজন।
আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেওয়া তরুণদের পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও জানতে চায় সংবাদমাধ্যমটি। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি ব্যক্তিদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে; চাইলে পরিচয় গোপন রেখেও মতামত দেওয়া যাবে।
তরুণদের এই অভিজ্ঞতা জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংবাদ শিরোনামে বিক্ষোভের সংখ্যা, সংঘর্ষ কিংবা গ্রেপ্তারের খবর উঠে এলেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও হতাশা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ আন্দোলন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: যে সিদ্ধান্তগুলো তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে, সেগুলোতে তাদের কণ্ঠ কতটা শোনা হচ্ছে? আর রাজপথে তৈরি হওয়া পরিবর্তনের প্রত্যাশা কতটা বাস্তব সংস্কারে রূপ নিচ্ছে?
সূত্র: আলজাজিরা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান




