বিজ্ঞাপন

জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বাজারে নৈরাজ্য

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | সকাল ১০:২৩
শেয়ার করুন:

সরকার ঘোষিত অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধের বেশিরভাগই এখন বাজারে দুষ্প্রাপ্য। সরকারি হাসপাতালগুলোর ফার্মেসি কিংবা বেসরকারি কোথাও মিলছে না অত্যাবশ্যকীয় এসব ওষুধ। তিন দশক আগে তৈরি করা তালিকায় এসব অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম অপরিবর্তিত থাকায় উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছে কোম্পানিগুলো। বাজারে না পাওয়ায় বেশি দামে একই ধরনের অতিরিক্ত ফর্মুলেশন কিংবা তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের ওষুধগুলো কিনে ঠকছে সাধারণ মানুষ। ফলে বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি নানা শারীরিক জটিলতা।

অত্যাবশ্যকীয় তালিকার অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ওষুধ প্যারাসিটামল।

সাধারণ জ্বর, সর্দি, ফ্লু ও যেকোনো প্রাথমিক শরীর ব্যথা-বেদনায় এই ওষুধ (৫০০ এমজি) ব্যবহৃত হয়। এটি উৎপাদন ও বাজারজাত করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিয়েছে শ’খানেক কোম্পানি। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি সারা বছর ওষুধটি তৈরি করে। ফলে ডেঙ্গু বা কোনো বিশেষ রোগের পিক সিজনে এ ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি দেখা যায়। এ সুযোগে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্যারাসিটামলের সঙ্গে অতিরিক্ত ফর্মুলেশন যুক্ত করে নাপা (প্যারাসিটামল) এক্সট্রা, নাপা ওয়ান, নাপা র‍্যাপিড, নাপাডল বা নাপা এক্সটেন্ড কিংবা একই গ্রুপের অন্য ব্র্যান্ড এইস প্লাস, টামেন টারবু নাম যুক্ত করে বেশি দামে বিক্রি করছে বিভিন্ন কোম্পানি। ফলে যে সাধারণ প্যারাসিটামল খেয়েই রোগীর কাজ হয়ে যেত, এখন প্রচারের প্রভাবে বেশি দামে অতিরিক্ত ফর্মুলেশনযুক্ত প্যারাসিটামল গ্রুপের ওষুধ কিনে খেতে হচ্ছে। অন্যান্য ওষুধের জেনেরিক গ্রুপের ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যাচ্ছে। এসব অতিরিক্ত ফর্মুলেশনের ওষুধ খেয়ে রোগীদের নানা শারীরিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

অ্যামোক্সিসিলিন ৫০০ মিলিগ্রাম ক্যাপসুলটি মূলত শ্বাসনালির সংক্রমণ, কান ও গলার প্রদাহ, মূত্রনালির সংক্রমণ এবং ত্বকের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্বল্পমূল্যের প্রথম সারির জনপ্রিয় অ্যান্টিবায়োটিক। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে অর্ধশতাধিক ফার্মা কোম্পানির ওষুধটি উৎপাদনের লাইসেন্স রয়েছে। কিন্তু ৮-১০টি কোম্পানি এই অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন করে। সাধারণ রোগীদের জন্য বহুল ব্যবহৃত ও তুলনামূলক কম দামের এই ওষুধটি সহজলভ্য না থাকায় বেশিরভাগ চিকিৎসক দামি চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করছেন। এতে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হচ্ছে।

একইভাবে সেফুরক্সিম অ্যান্টিবায়োটিকটি যেসব সমস্যায় ব্যবহার করা হয়, তার প্রায় বেশিরভাগ ইন্ডিকেশনে অ্যামক্সিসিলিন, ডক্সিসাইক্লিন অথবা ফ্লুক্লাক্সসিলিন ব্যবহার করা যায়। অথচ এই তিনটি অ্যান্টিবায়োটিক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় রয়েছে। যেখানে সেফুরক্সিম+ক্লাভুরিক এসিড অ্যান্টিবায়োটিক ৫০০ এমজির দাম কোম্পানিভেদে ৫৫-৮৫ টাকা, সেখানে অ্যামক্সিসিলিন ৫০০ এমজির দাম মাত্র সাড়ে সাত টাকা, ডক্সিসাইক্লিন ১০০ এমজির দাম আড়াই টাকা, ফ্লুক্লাক্সসিলিন ৫০০ এমজির দাম ১৪ টাকা। স্বল্পমূল্যের এসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম কিছু টাকা করে বাড়িয়ে দিলেই কোম্পানিগুলো এসব ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহী হতো, গ্রাহকদের আর উচ্চমূল্যে অন্য অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে হতো না। এতে সাধারণ রোগীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হতো।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত্যাবশ্যকীয় এসব অ্যান্টিবায়োটিক সহজলভ্য করা গেলে সাধারণ রোগীরা খুব কম খরচেই তাদের চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পারতেন। পাশাপাশি হাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি নিতে হতো না।

শ্বাসনালি ও মূত্রনালির সংক্রমণ চিকিৎসায় কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে পরিচিত সিপ্রোফ্লোক্সাসিন। কিন্তু বড় বড় ফার্মেসি ঘুরে দেখা যায়, বড়জোর ১৫-২০টি কোম্পানির ওষুধ বাজারে আছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় এ ওষুধটি থাকলেও কাঁচামাল আমদানির বাড়তি খরচ এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত দামের বিরাট ফারাক থাকায় অনেক কোম্পানি এ ওষুধ উৎপাদন অনেকটা বন্ধ রেখেছে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের পাশাপাশি আরেক বিপত্তি হচ্ছে কোম্পানিভেদে বিভিন্ন ব্রান্ডের ওষুধের দামের পার্থক্য। এটি ফার্মা খাতে আরেক অসম পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। সাধারণ ভোক্তারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি মাঝারি-ছোট ফার্মাসিউটিক্যালগুলো তীব্র বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, এজিথ্রোমাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক ৫০০ এমজি ট্যাবলেটটির প্রতি পিসের দাম কোম্পানিভেদে ২৭-৫০ টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কোম্পানিকে। একই জেনেরিক ওষুধের বিভিন্ন দাম অনুমোদন দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সিজিএমপি (কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস) ফরমুলা ব্যবহার করে ফার্মা কোম্পানিগুলোকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর উৎপাদনের অনুমতি দিলেও মূল্যের ক্ষেত্রে কম-বেশি অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে কমমূল্যে পাওয়া কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। মূল্য নির্ধারণে প্রথম সারির প্রভাবশালী কোম্পানিগুলো অনেকটা ভালো মূল্য আদায় করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি এবং ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শেখ জহির রায়হান জানান, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ মানেই হচ্ছে সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে এর সহজলভ্যতা থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমানে আমরা এর বৈপরীত্য দেখছি। আইনত লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি অংশ তৈরি করতে বাধ্য। আর এটি সঠিকভাবে মনিটর হচ্ছে না। তবে সার্বিক অবস্থা বিচারে বাস্তবতা হচ্ছে, বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ ও নানা বিষয় বিবেচনা করে উৎপাদকদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের বসে পুনঃ মূল্য নির্ধারণ জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে এসব ওষুধ সহজলভ্য হয়।

এ প্রসঙ্গে নোভাটেক ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাসহ অনেক ওষুধের মূল্য পুনর্নির্ধারণের এখনই সময়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল, কাঁচামালের তীব্র সংকট, ডলারের তারতম্যসহ বিগত তিন দশকে এসব ওষুধের মূল্য কাঠামোর বড় কোনো পরিবর্তন বা যৌক্তিক সমন্বয় হয়নি। ফলে বর্তমান বাজারদর সরকারের অনেক বছর আগে বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে, যা কোম্পানিগুলোর জন্য লোকসান ডেকে আনছে। অত্যাবশ্যকীয় এসব ওষুধের দাম যদি যৌক্তিকভাবে সামান্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে অনেক কোম্পানি এসব ওষুধ তৈরিতে আগ্রহী হবে এবং সাধারণ মানুষ দারুণ উপকৃত হবে। তেমনি একই জেনেরিকের ওষুধ কোম্পানিভেদে বিভিন্ন দাম অনুমোদনে ছোট-মাঝারি কোম্পানিগুলো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। অথচ কাঁচামাল, উৎপাদন প্রক্রিয়া সবই এক ও অভিন্ন।

ওষুধ উৎপাদনে সংশ্লিষ্টরা জানান, ওষুধের দাম বৃদ্ধির জন্য সরকারের কিছু নীতিগত বিষয়ও জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে ওষুধে ভ্যাট ও কর সবচেয়ে বেশি। এটি অত্যাবশ্যকীয়সহ সব ওষুধের জন্যই প্রযোজ্য। বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদন কোম্পানিগুলোকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। আর খুচরা বিক্রেতাদের আরো প্রায় আড়াই শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট দেওয়া লাগে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিবেশী ভারতে ওষুধে ভ্যাট দিতে হয় সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচ শতাংশ। আর পাকিস্তানে এক থেকে দুই শতাংশের মতো।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির আমার দেশকে বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ওষুধের দাম পুনর্নির্ধারণের জন্য আমরা সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে আসছি। আশা করছি, সংশ্লিষ্টরা এটি বিবেচনা করবেন। একই জেনেরিকের ওষুধে কোম্পানিভেদে ভিন্ন ভিন্ন দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি আসলেই বিবেচনার বিষয়। এটির একটি যৌক্তিক সমাধান জরুরি।

সার্বিক বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন জানান, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলোর সহজপ্রাপ্যতা, তালিকা হালনাগাদ করা এবং অন্যান্য বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। কমিটি গঠিত হলে তারা সরকারের কাছে বিভিন্ন বিষয় সুপারিশ আকারে পেশ করবে, যার ভিত্তিতে সরকার ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কার্যকর পদক্ষেব নেবে।

Google News Icon
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো