ছবি ভিডিও ভিডিও
জাতীয়

গ্রিডে যুক্ত হবে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে।

আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কুইক রেন্টালের নামে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে সাশ্রয়ী ও টেকসই পন্থায় বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি জানান, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ খাতে বিনিয়োগকারীরা যাতে অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করবে সরকার।

নিজের বাসায়ও সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাসায় ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুতের কিছু ইউনিট ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশকে আমদানিনির্ভর করে ফেলার কারণে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিজেলের মজুদ বাড়ানো, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময় নষ্ট না করে কীভাবে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, সেটিই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে কাজ চলছে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্যোক্তা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিযোগিতায় তিন শতাধিক তরুণ-তরুণী উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করেছেন। তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিতদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। তরুণদের উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়নে অর্থের অভাব যেন বাধা না হয়, সে জন্য চলতি বাজেটে স্টার্টআপ খাতে বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কৃষি খাতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে হিমাগার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।

সৌরবিদ্যুৎ খাতের আট হাজারের বেশি সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকসেবা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোকে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হওয়ার অনুরোধ করেন।

তিনি আরও বলেন, শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য নয়, জনগণের জন্য বিদ্যুতের ব্যয় কমানোও অগ্রাধিকার। এ জন্য সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো যন্ত্রপাতির আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদনে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’ কেবল দুই দিনের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ আয়োজন থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হবে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়। সূর্যের আলোকে দেশের সম্পদে পরিণত করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।