
দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করতে ১০৭ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনছে সরকার। ৯টি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের অধীনে ১২ বিষয়ে এই ১০৭ প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা। সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ২২ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে এসব বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিনিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন এই টাস্কফোর্স সূত্রে জানা যায়, সরকারের বিনিয়ন্ত্রণের অনেকগুলো প্রতিশ্রুতিতে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। আর বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব করবে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসহ (এফবিসিসিআই) চারটি চেম্বার ও দুটি অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ) প্রতিনিধিরা।
টাস্কফোর্স সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৭টি সমস্যা আয়কর, শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংক্রান্ত। এ ছাড়া বাকি ৯টির মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সংক্রান্ত ২১, ইনভেস্ট বাংলাদেশ ১৯, বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯, পরিবেশ অধিদপ্তর ৩, ফায়ার সার্ভিস ৩, বেপজা ৩, এসএমই ফাউন্ডেশন ২ এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় একটি। দীর্ঘদিনের এসব ব্যবসায়িক জটিলতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সরকার ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এ টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দেশে দেশে বিনিয়ন্ত্রণের সুফল
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস পোশাক খাত। এ খাতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম। ভিয়েতনামের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে পলিটব্যুরোর রেজল্যুশন ৬৮-এর অধীনে দেশটির ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে ১৪টি মন্ত্রণালয়ে তিন হাজারের বেশি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বাতিল বা সহজীকরণ করা হয়েছে এবং দুই হাজার ২০০-এর বেশি ব্যবসায়িক শর্ত বিলোপের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস র্যাংক ২০১৪ সালে দেশটি ৯১তম অবস্থান থেকে ২০২০ সালে ২৯ ধাপ অগ্রগতির মাধ্যমে ৭০তম অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। সংস্কারের ফলে দেশটিতে বছরে প্রায় ১.৩১ বিলিয়ন ডলার পরিপালন ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৩ হাজার ২০০ প্রক্রিয়াকরণ-দিবস বেঁচে যাচ্ছে।
অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০১৪ থেকে ২০২৫ মেয়াদের নেওয়া ব্যবসা সহজীকরণ ও জনবিশ্বাস আইনের আওতায় ৩,৭০০-এর বেশি আইনি বিধানকে অপরাধমুক্ত করেছে। এর পাশাপাশি ব্যবসায়িক নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ করতে ‘স্পাইস প্লাস’ নামের এক ফর্মেই ১১টি বিভিন্ন সেবা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। দেশটিতে ১৫ লাখ রুপি পর্যন্ত মূলধনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস র্যাংকে ২০১৫ সালে ভারতের অবস্থান যেখানে ছিল ১৪২তম, সেখানে ২০২০ সালে তা ৭৯ ধাপ এগিয়ে ৬৩তম স্থানে উন্নীত হয়।
এ ছাড়া ২০০৬ থেকে ২০২০ সময়ে ৫১টি ব্যবসায়িক সংস্কার এনেছে জর্জিয়া। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস র্যাংকে ২০০৬ সালের ১১২ থেকে ২০২০ সালে দেশটি সপ্তম স্থানে উঠে আসে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া সরকারি-বেসরকারি বিশেষ টাস্কফোর্স পেমুদাহ (২০০৭) আওতায় দেশটির ব্যবসা শুরু করার সময় ৩৭ দিন থেকে ছয় দিনে নামিয়ে আনা হয়। ডুয়িং বিজনেস র্যাংকে ২০১১ সালের ২৩তম থেকে ২০২০ সালে ১২তম অবস্থানে উঠে আসে দেশটি।
বাংলাদেশে বিনিয়ন্ত্রণের অগ্রযাত্রা
সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে ১০৭ সমস্যা তুলে ধরেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছেÑবিভিন্ন সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, একই তথ্য ও দলিল একাধিক সংস্থায় বারবার দাখিল, সমন্বিত ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থার অভাব এবং ধারাবাহিক অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা। তবে ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী লাইসেন্স, অনুমতি, নিবন্ধন, ছাড়পত্র ও অনাপত্তি সহজীকরণে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে দুটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছে। সংস্থাটি ব্যবসা শুরুর সময় ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, চলতি বছরই অনলাইনে করপোরেট রিটার্ন জমা করার ব্যবস্থা চালু হবে। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আওতা বাড়ানো, কমপ্লায়েন্ট পোশাক প্রতিষ্ঠানের বন্ড অডিট রহিত করা, ৬০ কিলোমিটার দূরত্বের ইউনিটে কন্টিনিউয়াস বন্ড সুবিধা দেওয়া এবং ন্যূনতম ৩০ শতাংশ ভ্যাটের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হবে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমাতে নির্ভরযোগ্য আমদানিকারক এবং কম ঝুঁকির পণ্যের ক্ষেত্রে ঋণপত্রের বাধ্যতামূলক ব্যবহার ধাপে ধাপে শিথিল করার বিষয় বিবেচনার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী মূল্যনির্বিশেষে ঋণপত্র ছাড়া আমদানিতে বাধা নেই।
পরিবর্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী শিল্পকারখানার স্থান নির্বাচনসংক্রান্ত ছাড়পত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্রে আবেদন অনলাইনে গ্রহণ এবং নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও নবীন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিপালন নীতিমালা প্রণয়ন এবং লাইসেন্স গ্রহণ, নবায়ন ও নিয়মিত প্রতিপালনের শর্ত শিথিল করবে সরকার। একইসঙ্গে ইনভেস্ট বাংলাদেশের উদ্যোগে বিনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথাযথ মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত ওয়েবসাইট উন্নয়নের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে সেবাগ্রহীতারা সরাসরি সেবাদানে অনিয়ম বা অভিযোগ দাখিল করতে এবং এ বিষয়ের প্রতিকার সম্পর্কে জানতে পারবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের চোখে বিনিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার পথে ১০৭ সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। কয়েকটি সমস্যা ইতোমধ্যে সমাধানের জন্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। যেসব বিষয় এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে, তা আগামী এক মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করে হালনাগাদ তথ্য দিতে হবে।
সরকারের এ উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শুল্ক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পণ্যের হারমোনাইজড সিস্টেম (এইচএস) কোড নির্ধারণ ও মূল্যায়নে খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পণ্য পরিদর্শনের ক্ষেত্রেও বিলম্ব এবং হয়রানির মুখে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের। এছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষার সময় অবৈধ আর্থিক সুবিধা চাওয়া এবং কাঁচামালের এনটাইটেলমেন্ট অনুমোদনে জটিলতার অভিযোগও রয়েছে।



