ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় আদালত থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের গালিগালাজ করেছেন চিত্রনায়িকা পরীমণি। এ সময় তার নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীদের আঘাতে সাংবাদিক ও বিচারপ্রার্থীসহ অন্তত ৪ জন আহত হয়েছেন। এর আগে আদালতে ঢোকার সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে সমকাল সাংবাদিকের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন পরীমণি। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ ঘটনা ঘটে।
আহতরা হলেন- জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান ও মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল কাউছার, আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেন ও বিচারপ্রার্থী সুজন চন্দ্র। আশিকুজ্জামানের পিঠে এবং কাউছারের কাঁধ ও হাতে আঘাত লাগেছে। ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তারা।
আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেন বলেন, 'আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে যান পরীমণি, অশ্লীলভাষায় গালাগাল করেন।' এক পর্যায়ে পরীমণি তার হাতে খামচি দেন বলে অভিযোগ করেন সাংবাদিক সিয়াম।

আহত সুজন চন্দ্র
এর আগে, সকাল সোয়া ১১টার দিকে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছেন পরীমণি। আদালতের কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত গাড়িতে ছিলেন তিনি। নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরা তখন তাকে ঘিরে রাখেন। এরপর আদালত কক্ষে প্রবেশের সময় সাংবাদিক ও উৎসুক লোকজন ভিড় করেন। ভিড়ের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মীদের বেস্টনিতে এগিয়ে যান পরীমণি। লিফটে ওঠার সময় সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও করতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়। ঠিক এই সময় সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন রাজুর মোবাইল ফোন কেড়ে নেন পরীমণি। পরে পরীমণির হাত থেকে ফোনটি ফিরিয়ে নেন রাজু।

রবিউল হোসাইন রাজু বলেন, ‘পরীমণি আদলতে এলে আমরা সংবাদিকরা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করি। লিফটে ওঠার সময় উত্তেজিত হয়ে পরীমণি আমার ফোনটি কেড়ে নেন। ওই ফোনটি দিয়ে আমি ভিডিও ধারণ করছিলাম। পরীমণির নিরাপত্তারক্ষীরা এ সময় আমার ট্রাইপড ভেঙে ফেলেন।'
পরে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মাহফুজুর রহমানের আদালতে যান পরীমণি। আদালতের বেঞ্চ থেকে পরীমণি আসামির কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান। তার আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী জামিন চেয়ে শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত ৫০০ টাকা মুচলেকায় পরীমণির জামিন মঞ্জুর করেন।
জামিন নিয়ে আদালত থেকে বের হওয়ার সময় পরীমণিকে ঘিরে রাখেন তার নিরাপত্তারক্ষীরা। সাংবাদিকরা ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে গেলে আবার তারা ধাক্কাধাক্কি করেন। তাদের ধাক্কাধাক্কিতে আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সুজন চন্দ্রের মাথা ফেটে যায় বলে জানান উপস্থিত লোকজন। তার মাথা থেকে রক্ত বের হতে দেখা যায়।

নিচে এসে গাড়িতে ওঠার আগে আবার সমকালের রবিউল হোসাইন রাজুর দিকে তেড়ে যান পরীমণি। অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দেন। জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান জানান, পরীমণির নিরাপত্তারক্ষীরা তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল কাউছার বলেন, 'আদালত প্রাঙ্গণে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আমিসহ একাধিক গণমাধ্যমকর্মী আহত হয়েছেন। একজন বিচারপ্রার্থীর মাথা ফেটেছে। অথচ পুরো ঘটনা চলাকালে দায়িত্বে থাকা কোর্ট পুলিশের সদস্যদের ভূমিকা দেখা যায়নি। একজন আসামি প্রায় ১০ জন ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী নিয়ে আদালতে এসে যেভাবে মহড়া দিলেন এবং সাংবাদিক ও বিচারপ্রার্থীদের ধাক্কাধাক্কি ও মারধর করলেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।' আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীর এমন দাপট দেখানোর সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো- সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি। ঘটনাটি তদন্তেরও দাবি জানান।
ঘটনার পর দুপুর একটা ৪৩ মিনিটে পরীমণির সঙ্গে কথা বলে সমকাল। পরীমণি অভিযোগ করেন, ভিড়ের মধ্যে সাংবাদিকরা তার গায়ে পড়ার চেষ্টা করেন। আদালত থেকে বেরিয়ে তাদের দেখা পান।

তবে সমকালের রাজু বলেন, ‘এ ধরণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। পরীমণির সঙ্গে আমার দূরত্ব ছিল অনেক। সেখানকার ভিডিও দেখলেই সব পরিষ্কার হবে। আমার কেড়ে নেওয়া ফোনটি তার হাত থেকে নিয়েছি।’
সাংবাদিক সিয়াম হোসেন বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই আজ আদালত চত্বরে ছিলাম। পরীমণির গায়ে টাচ করার মতো এখানে কোনো ঘটনা ঘটেনি। তার নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরা এমনভাবে তাকে ঘিরে ছিলো, উল্টো তারাই আমাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছিল। এখানে পরীমণির গায়ে কীভাবে হাত লাগবে?’ পরীমণি আদালতে জামিন নিতে এসেছেন নাকি সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে এসেছেন এটাই এখন বড় প্রশ্ন বলে জানান তিনি।

সমকাল মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন রাজুর ভাঙা ট্রাইপড
২০২২ সালের ৬ জুলাই আদালতে মামলা করেন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন। আদালত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পরিদর্শক মনির হোসেন আদালতে পরীমনি ও জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেন। তাদের বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল আদালত দুই আসামিকে ২৫ জুন হাজির হতে সমন জারি করেন। ওই দিন আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তারা।
এরপর ২৭ মার্চ এ মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রিভিশন দায়ের করেন নায়িকা পরীমণি। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নবম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাজ্জাদুর রহমান খান আবেদন খারিজ করে দিয়ে মামলা চলতে বাধা নেই বলে আদেশ দেন।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সাইফুল ইসলাম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত