সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত স্বল্পমূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার সাধারণ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ১২ কেজির সরকারি সিলিন্ডারের দাম ৭৭৭ টাকা হলেও বেসরকারি বাজারে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে গ্রাহকদের প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি এলপিজি বিতরণব্যবস্থায় অনিয়ম, ভুয়া অনুমতিপত্র ব্যবহার এবং নির্ধারিত গ্রাহকের বাইরে সিলিন্ডার সরবরাহের অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের বরাতে জানা গেছে, সরকারি মূল্যে বরাদ্দ পাওয়া কিছু সিলিন্ডার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি এবং অন্য সিলিন্ডারে গ্যাস স্থানান্তরের মাধ্যমে বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি এলপি গ্যাস পিএলসি উৎপাদিত গ্যাসের একটি অংশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় সরবরাহ করে। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ও তালিকাভুক্ত ডিলারদের মাধ্যমে নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পদ্মা অয়েল ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানিকে বিভিন্ন পরিমাণ সরকারি এলপিজি বিতরণের জন্য দেওয়া হয়। সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সরাসরি সরবরাহের জন্যও সিলিন্ডার বরাদ্দ ছিল।
তবে এসব সিলিন্ডার শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ গ্রাহকের একটি বড় অংশ সরকারি দামের গ্যাস কেনার সুযোগ পাচ্ছেন না।
দুদকের অনুসন্ধানে কিছু অনুমোদিত ডিলারের বিরুদ্ধে কার্যকর খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র ও গ্রাহক নেটওয়ার্ক না থাকা সত্ত্বেও সরকারি মূল্যে সিলিন্ডার বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ডিলারের কেউ কেউ বরাদ্দ করা গ্যাস সাধারণ গ্রাহকের কাছে বিক্রি না করে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একাধিক ডিলারের অনুমতিপত্র ব্যবহার করে একজন ব্যক্তি একসঙ্গে কারখানা থেকে সিলিন্ডার উত্তোলন করতেন। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ও জাল লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি গ্যাস সংগ্রহ এবং বেসরকারি সিলিন্ডারে স্থানান্তরের বিষয়টিও দুদকের অভিযানে উঠে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
পদ্মা অয়েলের বগুড়া সেলস অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার জন্য ওই অফিসে প্রতি মাসে আট দফায় ৪৭৫টি করে সিলিন্ডার আসে। তাঁর ভাষ্য, এর ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ছয়টি সেনানিবাসে সরবরাহ করা হয়। কিছু সিলিন্ডার নষ্ট থাকে এবং অবশিষ্টগুলো প্রায় ২০০ ডিলারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
তিনি জানান, একজন ডিলার সাধারণত ২৫ থেকে ২৬ দিন পর ১০ থেকে ১২টি সিলিন্ডার পান। পরিমাণ কম হওয়ায় কয়েকজনের বরাদ্দপত্র একত্র করে সিলিন্ডার উত্তোলনের ঘটনা ঘটে বলেও তিনি ব্যাখ্যা দেন।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ১৮ লাখ টন। এর প্রায় ৮০ শতাংশ গৃহস্থালি রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। সরকারি এলপি গ্যাস পিএলসির বাজারে অংশগ্রহণ মাত্র ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ও কৈলাশটিলার প্ল্যান্টের উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও সংরক্ষণব্যবস্থা ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে মোংলা, টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও রাজাবাড়ীতে সংরক্ষণ এবং বোতলজাতকরণ অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি উদ্যোগে এলপিজি আমদানির জন্য পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও সরবরাহকারী চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। জাহাজভাড়া ও সরবরাহসংক্রান্ত ব্যয় নিয়ে মতপার্থক্যকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এলপি গ্যাস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আমীর মাসুদ বলেছেন, প্রয়োজনীয় জনবল ও সংরক্ষণসুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বিতরণের ক্ষেত্রে অন্যান্য তেল বিপণনকারী কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। সরকারি গ্যাস অন্য সিলিন্ডারে স্থানান্তর করে বিক্রির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
সরকারি এলপিজির লক্ষ্য ছিল দেশীয় উৎসের গ্যাস বোতলজাত করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সীমিত উৎপাদন, বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা, সংরক্ষণসক্ষমতার ঘাটতি এবং অনিয়মের অভিযোগ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
স্বল্পমূল্যের সরকারি গ্যাস প্রকৃত গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ বরাদ্দব্যবস্থা, ডিলারদের কার্যক্রম যাচাই, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি থেকে প্রতীয়মান হয়।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সাইফুল ইসলাম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত