নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ পেয়েছিলেন বাকের আল মাহমুদ (ছদ্মনাম)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়নি তার। বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি উপজেলার বাসিন্দা এই প্রার্থীর নিয়োগ আটকে যায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) দুটি প্রতিবেদনের ভিন্ন তথ্যের কারণে।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহমুদকে নিয়ে এসবির একটি প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে তার বাবার ব্যবসায়িক পরিচয়ের পাশাপাশি অতীতে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সংসদ নির্বাচনের কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যের নজরে এলে মাহমুদের পক্ষে তিনি একটি ডিও লেটার দেন।
এর কয়েক মাস পর একই বছরের ৭ জুলাই এসবি আরেকটি প্রতিবেদন পাঠায়। সেখানে আগের রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা না রেখে বলা হয়, মাহমুদের বাবা একজন ব্যবসায়ী এবং বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য নন। পাশাপাশি পরিবারের কোনো সদস্য রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নন বলেও উল্লেখ করা হয়। দুই প্রতিবেদনের তথ্যের অসামঞ্জস্যের মধ্যেই নিয়োগ থেকে বাদ পড়েন মাহমুদ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ৩৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত অন্তত ২৩৯ জন পিএসসির সুপারিশ পেয়েও সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে ৪৩তম ও ৪৪তম বিসিএসেও পুলিশি যাচাইয়ে নেতিবাচক মন্তব্য থাকার কারণে আরও আড়াইশর মতো প্রার্থী নিয়োগবঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি চাকরির জন্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের তথ্য রয়েছে কি না, সেটির বদলে অনেক সময় তার নিজের এবং পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় খতিয়ে দেখা হয়। এমনকি আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও যাচাইয়ের আওতায় আনা হয় বলে তাদের দাবি। কারও কারও অভিযোগ, যাচাই প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে সন্তুষ্ট করতে না পারলেও নেতিবাচক মন্তব্য যুক্ত করা হয়েছে।
ক্যাডার নিয়োগের পাশাপাশি নন-ক্যাডার পদ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে বিভিন্ন সময়ে বঞ্চিত প্রার্থীদের আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর পুনরায় যাচাই করে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
বিধিমালায় যা বলা আছে
১৯৮১ সালের বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীকে কেবল পুলিশি প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য থাকার কারণে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার সরাসরি বিধান নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কোনো প্রার্থী ফৌজদারি অপরাধে জড়িত বা মেডিকেল পরীক্ষায় অযোগ্য প্রমাণিত হলে তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রার্থীর বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেটিকে প্রার্থীর চাকরির যোগ্যতা নির্ধারণের ভিত্তি করা উচিত নয়। পুলিশি যাচাইয়ের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—প্রার্থী নিজে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বা গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা যাচাই করা।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে কিংবা তিনি দাগি অপরাধী হলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শারীরিক অযোগ্যতা প্রমাণিত হলেও প্রার্থীকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এসব কারণ ছাড়া নিয়োগ আটকে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
৪৪তম বিসিএসেও বাদ পড়েছেন ১৮৬ জন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে ৪৪তম বিসিএসের গেজেট প্রকাশ করা হয়। সেখানে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ১৮৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অন্য প্রার্থীরা চাকরিতে যোগ দিলেও এসব প্রার্থী এখনো নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বঞ্চিতদের অভিযোগ, পুলিশি যাচাইয়ের সময় তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। ৪৩তম বিসিএসেও অন্তত ৬৫ জন পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও গেজেটে নাম না থাকায় চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি।
আগের পাঁচ বিসিএসের চিত্র
পিএসসির সুপারিশ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগের তথ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।
৩৮তম বিসিএসে পিএসসি ২ হাজার ৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ২ হাজার ১৫১ জনকে। ফলে ৫৩ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগ পাননি।
৩৯তম বিশেষ বিসিএসে সুপারিশ ছিল ৬ হাজার ৭৯২ জনের। বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয় ৬ হাজার ৭৩২ জনকে। বাদ পড়েন ৬০ জন।
৪০তম বিসিএসে পিএসসির সুপারিশ ছিল ১ হাজার ৯৬৩ জনের। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হয় ১ হাজার ৯৩১ জনের জন্য। এতে ৩২ জন নিয়োগবঞ্চিত হন।
৪১তম বিসিএসে ২ হাজার ৫২০ জনের সুপারিশের বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয় ২ হাজার ৪৫৯ জনকে। ফলে ৬১ জন নিয়োগ পাননি।
৪২তম বিশেষ বিসিএসে ৪ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ করা হলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ৩ হাজার ৯৬৭ জনকে। এ পর্যায়েও ৩৩ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগ থেকে বাদ পড়েন।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জানানো হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাচে পিএসসির সুপারিশ পেয়েও অনেক প্রার্থী নিয়োগবঞ্চিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ২৫৯ জনকে পরবর্তীতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই বন্ধের সুপারিশ
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রচলিত পদ্ধতি বাতিলের সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, এ ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনপ্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।
এ ছাড়া লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে প্রার্থীর পুলিশি যাচাই না করার সুপারিশও করেছে কমিশন। সুপারিশ অনুযায়ী, বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশ বিভাগের কাছে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য চাওয়া যেতে পারে।
প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিয়োগ যাচাইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে অপরাধ ও আইনি অবস্থাকে রাখার সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো বিসিএসের ফল প্রকাশ হয়নি। তবে পিএসসির সুপারিশ অনুযায়ী মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। নিয়মের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ সাইফুল ইসলাম, কর্পোরেট অফিস : ৩৪৩ উত্তর নয়ানগর, কোকাকোলা রোড, বারিধারা ব্লক - জে, ভাটারা, ঢাকা ১২১২, মোবাইল : ০১৭৪১০০৩৫১১, ০১৭৪১০০৩৫১৭
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত